সিলেট প্রতিনিধি : সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ–কানাইঘাট) আসন-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান ‘দেওয়াল ঘড়ি’ প্রতীকে বিপুল ভোটে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। প্রাপ্ত ফলাফলে তিনি মোট ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ‘খেজুরগাছ’ প্রতীকে পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। ফলে দুই প্রার্থীর মধ্যে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৮১ ভোট।
৫৯ বছর বয়সী আবুল হাসান জকিগঞ্জ উপজেলার মাঝরগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা, ইমামতি ও ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯৩ সাল থেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি ২০০০ সালের জুন মাস থেকে জকিগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ-এর ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি জামিয়া ইসলামিয়া দারুসসুন্নাহ মোহাম্মদিয়া লামারগ্রাম মাদ্রাসার শিক্ষক, ফতোয়া ও ইসলামী গবেষণা বিভাগের প্রধান এবং সিলেট অঞ্চলের জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা হিসেবে পরিচিত।
নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি জকিগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুম্মার বয়ান, খুতবা ও ইমামতি করেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত মুসল্লিদের ব্যাপক উপস্থিতিতে মসজিদ প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নামাজ শেষে মুসল্লিরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাকে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন।
বয়ান শেষে তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক বক্তব্য দেননি এবং যারা সমালোচনা করেছেন তাদের জন্যও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তিনি জকিগঞ্জ উপজেলা ও কানাইঘাট উপজেলা-বাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন এবং এলাকার উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবার সহযোগিতা চান।
এর আগে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সময় জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান ফলাফল প্রকাশ করলে সেখানে মানুষের ঢল নামে এবং প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য উপস্থিত জনতার উদ্দেশে দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন।
বিজয়োত্তর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আল্লাহর রাসুল (সা.) মিম্বর থেকে দেশ পরিচালনা করেছেন। সেই আদর্শ অনুসরণ করে আমি মসজিদের মিম্বর থেকে সংসদ ভবনে গিয়ে দেশের ও মিল্লাতের খিদমতে কাজ করতে চাই।” তিনি জানান, জকিগঞ্জ–কানাইঘাট এলাকার উন্নয়নে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে এবং শিক্ষা, যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণে কাজ করা হবে।
শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে তিনি কানাইঘাট উপজেলা পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও জনগণের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। তার বিজয়ে বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় এবং দারুসসুন্নাহ মোহাম্মদিয়া লামারগ্রাম মাদ্রাসায় বাদ মাগরিব শোকরানা মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে সন্তোষ দেখা গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জকিগঞ্জ–কানাইঘাট অঞ্চলে আলেম-উলামাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সংস্কৃতি স্থানীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করেন, ভবিষ্যতে তাকে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলে ইসলামী শিক্ষা ও মাদ্রাসা ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান বিজয়ের পর সৌহার্দ্য ও রাজনৈতিক সৌজন্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মামুনুর রশীদ চাকসু মামুন-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন এবং এলাকার উন্নয়ন, শান্তি ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। স্থানীয় মহলে এই সাক্ষাৎকে ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে প্রশংসা করা হচ্ছে।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি