দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ নিউজ টিভির সম্পাদক ও প্রকাশক ফরজুন আক্তার মনি ‘হলুদ সাংবাদিকতার কবলে জনজীবন’ শিরোনামে একটি বিশেষ কলাম লিখেছেন। পাঠকদের বৈদগ্ধ ও মনের খোরাক জোগাতে লেখাটি হুবহু প্রকাশ করা হলো।
সত্যের অপলাপ এবং আমাদের সমাজ সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। কিন্তু সেই দর্পণে যখন স্বার্থের ধুলো জমে, তখন সত্যের চেহারাটা বিকৃত হয়ে যায়। সাংবাদিকতার এই অন্ধকার দিকটিই আমাদের কাছে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ (Yellow Journalism) নামে পরিচিত। আজ যখন তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগে আমরা বাস করছি, তখন এই হলুদ সাংবাদিকতার আগ্রাসন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক ভয়াবহ বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে।হলুদ সাংবাদিকতা নতুন কোনো রোগ নয়, তবে এর বর্তমান রূপটি আরও বেশি সংক্রামক। উগ্র শিরোনাম, ভিত্তিহীন গুজব, অতিরঞ্জিত স্ক্যান্ডাল আর চটকদার ছবির আড়ালে আসল সত্যকে চাপা দেওয়াই এর মূল কাজ। কোনো একটি ঘটনার গভীর অনুসন্ধান না করে, কেবল জনমনে উত্তেজনা তৈরি করে ভিউ, লাইক কিংবা টিআরপি বাড়ানোর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা সাংবাদিকতার মহান পেশাকে কলঙ্কিত করছে।সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয় তখন, যখন ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে এই মাধ্যমটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কারো চরিত্র হনন করা, সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করা কিংবা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এর ফলে সাধারণ মানুষ কার ওপর ভরসা করবে, সেই জায়গাটি হারিয়ে ফেলছে। একটি ভুল সংবাদ একজনের জীবনকে ধ্বংস করে দিতে পারে, একটি সমাজকে দাঙ্গার মুখে ঠেলে দিতে পারে—এই বোধটুকুই যেন আজ লোপ পেতে বসেছে।ডিজিটাল মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের ফলে হলুদ সাংবাদিকতা এখন আরও সহজ হয়ে গেছে। একটি ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যে কেউ আজ ‘সাংবাদিক’ সেজে বসছে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের (Fact-check) ন্যূনতম বালাই নেই। ক্লিকবাইটের লোভে চটকদার থাম্বনেইল বানিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত।এই মহামারি থেকে বাঁচার উপায় কী? প্রথমত, সংবাদকর্মীদের নিজেদের পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতার জায়গায় শক্ত থাকতে হবে। সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতাই একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র ও পাঠক সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার নামে কেউ অপপ্রচার চালাতে না পারে, আবার একই সাথে আইনি সুরক্ষার নামে যেন সৎ সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ না করা হয়।সর্বোপরি, পাঠকদের ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা তথ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে। যেকোনো চটকদার খবর দেখেই তা বিশ্বাস বা শেয়ার করার আগে আমাদের একটু থামতে হবে, যাচাই করতে হবে। যতক্ষণ না আমরা সস্তা উত্তেজনার চেয়ে খাঁটি সত্যকে মূল্যায়ন করতে শিখব, ততক্ষণ হলুদ সাংবাদিকতার এই ব্যবসা বন্ধ হবে না। সমাজকে সুস্থ রাখতে হলে এই হলুদ বিষাক্ততার বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতেই হবে।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি