নিজস্ব প্রতিবেদক: হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলাধীন নারী কেলেঙ্কারি, চাঁদাবাজি, মামলা ও দুর্নীতির একাধিক চাঞ্চল্যকর অভিযোগে অভিযুক্ত এক বিতর্কিত ব্যক্তির গলায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ফেলোশিপ ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র সমালোচনা ও সুশীল সমাজের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির নাম আহমেদ আজাদ। তিনি উপজেলার ১০ নং দেবপাড়া ইউনিয়নের সিট ফরিদপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে। নীতি ও সুশাসনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত টিআইবি’র মতো একটি সংস্থার ফেলোশিপ এমন অসংখ্য মামলার আসামির পাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। এ যেন কালো পোশাকে সাদা দাগ।
এলাকার প্রবীণ মুরব্বি ও তৎকালীন চেয়ারম্যানগণের মাধ্যমে অনুসন্ধানে জানা যায়, আহমেদ আজাদ ছোটবেলা থেকেই নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাঁর অপরাধ ও অপকর্ম ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সাংবাদিকতা পেশা ও রাজনৈতিক দলের সদস্য পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। তাঁর ধারাবাহিক চাঁদাবাজি ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ২০০৩ সালে এলাকাবাসী তাঁর হাত থেকে বাঁচতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা ‘দৈনিক নওরোজ’-এ গুরুত্বের সাথে প্রকাশ পায়।
ভুয়া সংবাদ প্রকাশ করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলিং করা ছিল আজাদের নিত্যদিনের আয়ের উৎস। ভুয়া সংবাদ প্রকাশের দায়ে ২০০৬ সালে নবীগঞ্জ থানায় তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাংবাদিকতার কারণে দৈনিক মানবজমিন সহ বিভিন্ন পত্রিকা থেকে তাঁর নিয়োগ বাতিল করা হয় এবং একাধিক জায়গায় তিনি মুচলেকা দিতে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে ২০১০ সালে একই উপজেলার দরবেশপুর গ্রামের চিকিৎসক আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরীর কন্যা ফাহিমা আক্তার চৌধুরীর নামে একটি ভুয়া বিয়ের হলফনামা (এফিডেভিট) তৈরি করেন আজাদ। এই ভুয়া কাগজ দেখিয়ে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার ভয় প্রদর্শন করে তরুণীর ভাই নজরুল ইসলামের নিকট বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। নজরুল ইসলাম প্রাণের ভয়ে কিছু টাকা দিয়ে সাময়িক রক্ষা পেলেও, আজাদের বারবার চাঁদাবাজি ও ভীতিকর হুমকিতে অতিষ্ঠ হয়ে ২০১০ সালেই আদালতে মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় আজাদের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশিট দাখিল করলেও, আজাদের অব্যাহত হুমকিতে নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে বসবাস করতে না পেরে পরিশেষে আমেরিকায় পাড়ি জমান। আজাদের ভয়ে অসংখ্য মানুষ প্রাণনাশের হুমকির মুখে রয়েছেন এবং থানায় তাঁর নামে অসংখ্য জিডি (সাধারণ ডায়েরি) এন্ট্রি রয়েছে। শুধু তাই নয়, সাংবাদিক ফয়জুল ইসলাম নয়নকেও প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করলে তিনিও থানায় জিডি এন্ট্রি করে শেষ পর্যন্ত দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।
আজাদের চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা পাননি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। ২০১৫ সালে নবীগঞ্জ বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের এক ঠিকাদার তাঁর চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ আজাদকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। এই চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তারের সংবাদ দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
আজাদ তাঁর সাংবাদিক পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সার্টিফিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁর প্রথম স্ত্রীকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একটি বড় অঙ্কের বেতনের চাকরিতে বহাল রাখেন।বিগত ২০১৯ সালে নবীগঞ্জ উপজেলার ১১ নং গজনাইপুর ইউপি কায়স্থ গ্রামের
সাংবাদিক ফরজুন আক্তার মনি এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই শুরু করলে, আজাদ ও তাঁর দলবল কেবল সাংবাদিক ফরজুন আক্তার মনির ওপর নানা প্রকার হামলা, মামলা, জেল-জুলুম এবং নির্যাতন চালাতে থাকে। এর পাশাপাশি আজাদ ও তাঁর গ্রুপের লোকজন সরাসরি যুক্ত হয়ে মনির পরিবার ও তাঁর চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে গণমাধ্যমে একের পর এক কুৎসিত মিডিয়া ট্রায়াল চালায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র বিদ্বেষ ও ঘৃণ্য অপপ্রচার ছড়িয়ে দেয়। এই ধারাবাহিক অপপ্রচারের চরম মানসিক আঘাত সহ্য করতে পারেননি সাংবাদিক মনির বৃদ্ধ পিতা। আকস্মিকভাবে গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো এমন ভুয়া ও মানহানিকর সংবাদের খবর পেয়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তীব্র ক্ষোভে ও দুঃখে মাথা ঘুরে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই তাৎক্ষণিক মৃত্যুবরণ করেন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পরও আজাদ ও তাঁর ক্যাডার বাহিনী মনিকে বারবার খুন ও গুমের চেষ্টা চালিয়ে যায়।এছাড়াও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা আইনশৃংখলা মাসিক সভায় তার গ্রুপের লোকজন দিয়ে অশালীন বক্তব্য রেজুলেশনের অন্তর্ভুক্তের মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভণ্ডামির এক দৃষ্টান্ত মিডিয়ায় প্রকাশ হয়।
তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলুল হক চৌধুরী সেলিম ও সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজমা বেগম।
“শুধু বাইরেই নয়, কারাগারে বন্দী থাকাবস্থাতেও মনির ওপর আজাদ লোক মারফত মারধর ও হত্যাচেষ্টা চালিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে সে সময়ই প্রতিকার চেয়ে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল।”
এই নৃশংসতার প্রতিকার ও নিরাপত্তার দাবিতে ভুক্তভোগী মনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দায়ের করেছেন।”
২০২০ সালে তৎকালীন ৫ নং আউশকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান হারুন অভিযোগ তুলেন তার নিকট চাঁদা দাবি করতে আজাদ তাঁর নিজস্ব গ্রুপের লোকজন পাঠান। চাঁদা না পেয়ে আজাদের প্রত্যক্ষ উস্কানির মাধ্যমে চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন ‘অরবিট ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ ভাঙচুর করা হয়। এই ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে আজাদ ও তাঁর দলবল প্রকাশ্য দিবালোকে নারী সাংবাদিক ফরজুন আক্তার মনির ওপর হামলা চালিয়ে তাঁর শ্লীলতাহানি ঘটায় এবং ক্যামেরা ও গলার চেইন ছিনিয়ে নেয়। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নবীগঞ্জ থানায় মামলা রেকর্ড করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাবে আজাদ গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান, যদিও চেয়ারম্যানের দায়ের করা অন্য একটি মামলায় তিনি কারাবন্দী হয়েছিলেন।”চরম বিচারহীনতার শিকার হয়ে এবং নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন সাংবাদিক মনি।”
পারিবারিক ও নৈতিক স্খলনের ক্ষেত্রে জানা যায়, এক সন্তানের জননীর সাথে আজাদের পরকীয়ার বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হলে উক্ত নারীর সংসার ভেঙে ডিভোর্স হয়ে যায়। প্রথমে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানালেও ঘটনাটি বড় আকারে প্রকাশ পাওয়ার পর চাপের মুখে ২০২১ সালেই আজাদ ওই ডিভোর্সী নারীকে বিয়ে করেন এবং বর্তমানে তিনি এক সন্তানের জনক। ২০২৩ সালে আরেকটি কালো অধ্যায় প্রকাশ্যে আসে।
নিজেকে ‘জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত’ দাবি করা সাংবাদিক আহমেদ আজাদের সার্টিফিকেট জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে ঢাকাস্থ সাংবাদিক রেজওয়ান আহমেদ ও ফারহানা নীলার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দৈনিক সমকাল পত্রিকায় নিয়োগের জন্য আহমেদ আজাদ নবীগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের যে তথ্য জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছিলেন, তা সম্পূর্ণ অসত্য। তিনি ওই কলেজ থেকে পাস করেননি এবং তার জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তির দাবিটিও ভুয়া।
অন্যদিকে, সাংবাদিক মনির দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে ২০২৩ সালে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি করা আজাদের প্রথম স্ত্রী সম্পূর্ণভাবে চাকরিচ্যুত হন।
মনি’র ফেসবুক আইডি হ্যাকের পর নবীগঞ্জ থানায় জিডি করা হলেও, আজাদ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উল্টো ভুক্তভোগী মনিকেই হয়রানি করে। আজাদের এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে থানায় বিচার চাইতে আসলে, ওই দিনই তাকে থানায় আটকে রেখে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর, ২০২৫ সালে এই চক্রের সদস্য লেচু মিয়ার ছেলে শিহাব আহমেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মনি’র ফেসবুক আইডির কমেন্ট বক্সে হ্যাকিংয়ের লগইন তালিকার একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে। সেখানে সে ব্যঙ্গ করে কমেন্ট করে জানতে চায়, ‘এটা কী জানেন?’—যা মূলত তাদের হ্যাকিংয়ের প্রমাণ ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার এক ধরণের প্রকাশ্য ঔদ্ধত্য হিসেবে সামনে এসেছে।তার পরবর্তী ফেইসবুক আইডিও হ্যাকিং থেকে রক্ষা পায়নি। থানায় একাধিক জিডি এন্ট্রি থাকা সত্ত্বেও ১০ অক্টোবর রাত অনুমান ১০ টা থেকে আইডি ব্যবহার করতে পারছেন না। এভাবে চলমান হ্যাকিং ফাঁদে রয়েছে মনি।
পরবর্তী ২০২৫ সালে আজাদের ব্ল্যাকমেইল ও হেনস্তার শিকার হন গোপলার বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শেখ মারজানুজ্জামান। একজন সম্মানিত শিক্ষককে এভাবে অপদস্ত করার ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে স্থানীয় ছাত্রছাত্রী ও এলাকাবাসী। আজাদের গ্রেপ্তারের দাবিতে এলাকায় বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। গণদাবির মুখে পরবর্তীতে থানায় নিয়মিত মামলা রেকর্ড করা হলেও গ্রেপ্তার এড়াতে এবং প্রশাসনকে প্রভাবিত করতে উচ্চ মহলে জোর লবিং ও দৌড়ঝাঁপ চালান আজাদ। অবশেষে আজাদের নানামুখী চাপ ও কূটকৌশলের মুখে অসহায় হয়ে উক্ত শিক্ষক মামলাটি আপোষ করতে বাধ্য হন।
সর্বশেষ ২০২৬ সালেও নবীগঞ্জে একটি জোড়া খুনের (ডাবল মার্ডার) ঘটনায় আহমেদ আজাদের উস্কানিদাতা ও মামলার আসামি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আজাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ চার্জশিট প্রদান করলে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে নানাভাবে হয়রানি ও চাপের মুখে ফেলা হয়।
টিআইবি ফেলোশিপের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, ফেলোশিপ প্রাপ্তির জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকতে হবে এবং বয়স সর্বোচ্চ ৪০ বছর হতে হবে। কিন্তু নবীগঞ্জের হাজারো মানুষকে নিঃস্ব, বাড়িছাড়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে সর্বস্বান্ত করা এই চিহ্নিত অপরাধী ও অসংখ্য মামলার আসামি নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (ভোটার আইডি কার্ড) জালিয়াতি করে বয়স লুকিয়ে এবং সমস্ত অপরাধের তথ্য গোপন করে এই ফেলোশিপ হাতিয়ে নিয়েছেন, যা সচেতন সমাজকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এলাকাবাসীর জোর দাবি, অনতিবিলম্বে তদন্তপূর্বক এই জালিয়াতি চক্রের হোতার ফেলোশিপ বাতিল করে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হোক।
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি